LOADING

Type to search

সাইকেলের শহরে একদিন

ভ্রমন গল্প

সাইকেলের শহরে একদিন

Share

ঢাকাকে যদি রিকশার শহর বলা হয়ে থাকে তবে দুই চাকা বা সাইকেলের শহর বলা যেতে পারে আমস্টারডামকে।নিজ শহর ঢাকায় তিন চাকার বাহনটি ছিলো আমার অনেক পছন্দের যে কারণে বন্ধুরা মিলে ঘন্টায় রিকশা ভাড়া করে ঘুরাঘুরি করা ছিলো আমাদের বিনোদনের অন্যতম একটি মাধ্যম।দেশের বাইরে পড়তে কিছু মিস করি আর না করি তবে রিকশা ভীষণ মিস করি। যাই হোক, কথা বলছিলাম সাইকেলের শহর অ্যামস্টারডাম নিয়ে। ২০১৫ এর নভেম্বরে সেমিষ্টার ব্রেকে যাওয়া হল নেদারল্যাণ্ড।বাল্যকাল আর থিয়েটারের বন্ধু অমিত হৃদয় দেশটিতে থাকে বলে ঘুরার জন্য প্রথমেই বেছে নিলাম দেশটি। এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো।লণ্ডন থেকে মাত্র দেড় ঘন্টার ফ্লাইট অ্যামস্টারডামের। নভেম্বরের ৮ তারিখে যখন নামলাম দেশটির বিমানবন্দরে তখন সে যে কী উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষা গ্যাদাকালের বন্ধুকে দীর্ঘ ৭ বছর পর দেখার তা ঠিক ঐ মুহূর্তের জন্য বলে বোঝাতে পারবো না। আমার বন্ধুটি অ্যামস্টারডাম শহর থেকেও আরো ২ঘন্টার দূরের শহর গ্রোনিনগ্যানে থাকে।আমরা যখন দুতলা বিশিষ্ট ট্রেনে চড়ে সেই শহরে যাচ্ছিলাম তখন দুপাশে দেখা মিললো সারি সারি উইণ্ডমিলের।ট্রেনের জানালা দিয়ে যতই প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছিলাম মুগ্ধ হচ্ছিলাম ততই।ট্রেনের গতি যতই বাড়ছিলো ততই তেজ ও আলো ছড়াচ্ছিল আমাদের ছোটবেলার স্মৃতি আর গল্পে।

কথা বলতে বলতে কখন যে আমরা দুঘন্টা পার করেছি তা ঠাওর্ ও করতে পারিনি।পিপলস লিটল থিয়েটারে থাকাকালীন আমাদের সময়, বিভিন্ন দেশী ও আন্তর্জাতিক নাট্যউৎসবে একসঙ্গে অংশগ্রহণ করার অভিজ্ঞতা, একসাথে বেড়ে ওঠা,অন্যান্য বন্ধু-বান্ধব,দেশ-রাজনীতি সবকিছুই জায়গা করে নিয়েছিলো আমাদের আড্ডায়।যাই হোক, গ্রোয়েনগেন পৌঁছে প্রথম যে জিনিসটি চোখে পড়লো তা হলো সাইকেল পার্কিং এর জন্য বিশাল জায়গা।সব সময় গাড়ি পার্কিং এর জন্য বরাদ্দ জায়গা দেখে আসতে এমন অভ্যস্থ ছিলাম সেখানে সাইকেলের জন্য কোন আলাদা ব্যবস্থা দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম বটে।বন্ধু অমিত আমার বিস্ময়ভরা চোখ দেখে বেশ কিছু তথ্য দিলো সাইকেলের এ শহরটি নিয়ে। আর তা হলো নেদারল্যাণ্ডের প্রায় ৩৬ শতাংশ মানুষ তাদের বাহন হিসেবে সাইকেলকে বেছে নিয়েছে যেখানে মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ পাবলিক পরিবহনের উপর নির্ভরশীল। শুনে অবাক না হয়ে আম পারছিলাম না। শুধু তাই নয়, সাইকেল চালকদের জন্য রাস্তায় আলাদা লেন, পথ আর সাইকেল পার্কিংয়ের জন্য রয়েছে সুব্যবস্থা। তবে এখানে সাইকেল চোরের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তাই যার যার সাইকেলের দায়িত্ব ঠিক তার তার কাধেঁই।ও আরেকটি তথ্য অমিত জানালো আর তা হচ্ছে পুরো নেদারল্যাণ্ডে যে তিনটি শহরে সাইকেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশী তার মধ্যে অমিতের শহর গ্রোনিনগ্যানের অবস্থান দ্বিতীয় যেখানে প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ সাইকেল ব্যবহার করে থাকে।নেদারল্যাণ্ডের অন্যতম আরেকটি শহর জোয়ালাতে প্রায় ৪৬ আর অ্যামস্টারডামে প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষের প্রথম পছন্দ সাইকেল প্রধান যান হিসেবে।

আমার মতো ক্ষণিকের পর্যটক কিভাবে সাইকেল চালিয়ে তার মনের আশা পূরণ করবে তার সুব্যবস্থাও কিন্তু করে রেখেছে নেদারল্যাণ্ড ন্যাশনাল সাইকেল নেটওয়ার্কের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বাইসাইকেল ট্যুরিজম।নতুন সাইকেল ভাড়া নেয়া থেকে শুরু করে কোন পথে কিভাবে সাইকেল চালানো যাবে তার নির্দেশনা এবং সতর্কতা পর্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করা আছে সাইকেল স্মরণিকাগুলোতে।অমিতের কাছ থেকে মজার আরেকটি তথ্য জানা গেলো, দেশটিতে অনেকেই সাইকেল তাড়াহুড়োয় পার্ক করতে গিয়ে ভুলে যায় নির্দিষ্ট কোন লেনে তা রেখে এসেছিলো।আর এ কারণে অনেককেই সেই দিনের মতো পায়ে হেঁটে নয়তো বা পাবলিক পরিবহনে করে বাসায় ফিরতে হয়।অমিতের কথার সত্যতা যাচাই হলো তখনই যখন সে নিজেও তার সাইকেলটি খুঁজে পাচ্ছিল না আমাকে দেখাবে বলে। প্রায় আধঘন্টা ধরে তিনতলা বিশিষ্ট সাইকেল পার্কিং স্ট্যাণ্ডটি পরপর তিনবার ঘুরে আর শ’খানেক সাইকেল খুঁজে বের করা হলো বন্ধুর কাংঙ্খিত সাইকেলটি।তবে সেদিনের মতো আমরা সাইকেলে করে বাড়ি যাইনি যেহেতু আমার হাতে ও কাঁধে ট্রাভেল ব্যাগ ছিলো আর তার উপর প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগায় কোনমতে বাসে চড়ে বাড়ি পৌঁছালাম। তবে সাইকেলে চড়তে না পারার বেদনা ও আবদার ঘন্টাখানেক বাদেই পূরণ করলো আমার বন্ধুটি।তবে সেদিনের মতো সাইকেল একটি থাকায় অমিতের সাইকেলের পেছনে বসে আমরা ঘুরে দেখলাম গ্র্রোনিনগ্যান শহরটি।সাথে এও জানলাম যে শহরটি ২০০২ সালে নেদারল্যাণ্ডের অন্যতম সাইকেলের শহর হিসেবে পেয়েছে জয়ীর খেতাব।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *