LOADING

Type to search

বাঙালি পরিবেশনকারীর চোখে লন্ডনের পানশালার খদ্দের

ভ্রমন গল্প

বাঙালি পরিবেশনকারীর চোখে লন্ডনের পানশালার খদ্দের

Share

কারণ পুরো ইউরোপের একটা অংশ যুক্তরাজ্য তথা লন্ডনের কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রতিযোগিতামূলক এ শহরে কোনও কাজকে হেয় কিংবা অবহেলা করার অবস্থা, ইচ্ছা কিংবা সময় কারও নেই।

কথাগুলো বলছিলেন, লন্ডনের একটি পানশালায় কাজ করা বাংলাদেশি ছাত্রী সুমাইয়া শিরিন। বছর পাঁচেক আগে পড়ালেখার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছেন বিলাতে।

শিরিন জানাচ্ছিলো, পড়ালেখার খরচ সে বাসা থেকে নিলেও থাকা-খাওয়ার যোগান সপ্তাহে ২০ ঘন্টা কাজ করে নিজেই সামাল দিচ্ছেন। তবে অন্য সব বাঙালি শিক্ষার্থীদের থেকে শিরিন নিজেকে একটু আলাদা রাখছেন তার কাজের ধরনের কারণে।

বারটেন্ডার হিসেবে কোন বাঙালি মেয়েকে কাজ করতে দেখতে পাওয়াটা একটু দুরূহ। এর কারণ হিসেবে শিরিন উল্লেখ করলেন দুটি বিষয়- বাঙালি ধর্মীয় অনুশাসন ও রক্ষণশীল মনোভাব।

শিরিনের সঙ্গে কথা বলে কিছু মজার তথ্য জানা গেল। সে জানাল বারে যেসব অতিথিরা আসেন বিশেষত পুরুষরা তাদের সাথে বাঙালিদের পার্থক্য কোথায়।

হলিউড কিংবা বলিউডের সিনেমায় ইউরোপের পানশালার সংস্কৃতি সম্পর্কে যেমনটা দেখানো হয় বাস্তব জীবনে আদৌ তেমনটা নয়।

সিনেমায় দেখানো হয়- কোন সুদর্শন পুরুষ পানশালয়ে এসেই কোনও নারী বারটেন্ডারকে ওই রাতের জন্য তার সঙ্গী করে নেন।

এমনটি এখানে কোনভাবেই হয় না। আবার নারী বারটেন্ডারদের সিনেমায় স্বল্প পোশাকে দেখানো হয়। যা বাস্তবে সত্যি নয়। রিল আর রিয়েলের মধ্যে বোধহয় তফাৎ এখানেই।

সুরা পরিবেশনকারী- তিনি নারী কিংবা পুরুষ যিনিই হোন না কেন, তাকে সাদা অথবা কালো শার্ট কালো প্যান্টের সাথে পড়তে হয়। বারে এসে কোন ক্রেতা, বারটেন্ডারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবেন কিংবা তাকে কোন অশ্লীল প্রস্তাব দিয়ে বসবেন এমনটি কিন্তু হওয়ার নয়।

কারণ পানশালায় নিরাপত্তা কর্মীরা সবসময় টহল দিতে থাকেন। আর কোন ক্রেতা অসংলগ্ন আচরণ করলে তাকে সাথে সাথে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করলেন শিরিন, পরিচয়পত্র সম্পর্কিত। ১৮ বছরের নিচে কোন তরুণ-তরুণীকে পাব, বার কিংবা ক্লাবে ঢুকতে দেওয়া হয় না।

আর যারা ১৮ বছরের উর্ধ্বে তাদেরও ছবিসহ পরিচয়পত্র দেখিয়ে সদর দরজায় পা রাখতে হয়। এমন কি অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে অ্যালকোহল কিংবা সিগারেট পর্যন্ত বিক্রি করতে পারে না মুদির দোকান থেকে সুপারস্টোর পর্যন্ত।

শিরিন যে পানশালায় কাজ করছেন সেটি অবস্থিত পূর্ব লন্ডনে। যেখানে মূলত এশিয়ান বিশেষত ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশিদের আনাগোনা বেশি। তবে হ্যা অন্যান্য দেশের মানুষরাও সেখানে ঢুঁ মারে।

সুরা পরিবেশনকারী একজন নারী হওয়ায়, এশিয়ান ক্রেতারাও এসে একটু খোশগল্প করার সুযোগ খোঁজেন। মাঝে-মধ্যে সেলফি তোলার মতো ঢেঁকিগেলা অনুরোধের সম্মুখীন হতে হয়। তবে যারা ফোন নম্বর পাওয়া কিংবা ফেইসবুকে বন্ধু হওয়ার সুযোগের আশায় থাকেন তাদের বেশির ভাগকে খালি হাতে ফিরতে হয়।

আর বাংলাদেশিদের বিষয়ে কিছুটা হতাশা নিয়ে শিরিন জানালেন, নিজ দেশের মানুষেরাই মাঝেমধ্যে কটু কথা বলে যান আর কুৎসা রটনা করেন।

তিনি বললেন, “বাংলাদেশি ক্রেতারা মদের দোকানে এসে স্বদেশিয় কোন নারীকে বারটেন্ডার হিসেবে কাজ করতে দেখে মাথায় যেন হঠাৎ বাজ পড়ে।”

শিরিনের মতে, এশিয়ান আর ইউরোপিয় পুরুষদের মধ্যে প্রধান তারতম্যের জায়গা হলো দৃষ্টিগত। অর্থাৎ একজন ইউরোপিয় পুরুষ এসে তার ড্রিংকের অর্ডার দিয়ে সৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলেন।

“অন্যদিকে এশিয়ান ক্রেতারা তাদের দেশিয় নারী বারটেন্ডার দেখলে এমন একটি চাহনি দেন যাতে নিজের অজান্তেই স্ক্যান হয়ে যাবে পুরো শরীর”,অভিযোগ করলেন শিরিন।

এমনকি ড্রিংক সার্ভ করতে একটু দেরি হলে মাঝে-মধ্যে বিরক্তি প্রকাশ করতেও কার্পণ্য করেন না এশিয়ানরা। অন্যদিকে ইউরোপিয়রা ধৈর্য্য ধরার পাশাপাশি সুন্দর ব্যবহার উপহার দিতে ভুলেন না।

ইউরোপিয়ান পুরুষদের আরেকটি গুণের কথা উল্লেখ করলেন শিরিন। তারা কখনো অযথা কিংবা অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে বসেন না। এখানে এশিয়ানরা পুরো উল্টো চরিত্রের।

যেকোন কাজকে সম্মান দিতে জানেন পশ্চিমারা আর সেই কারণে তারা নারী-পুরুষের ভেদাভেদ করেন না। আর আমরা কাজকে বিচার করি সামাজিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে।

নারীরা নিজ গণ্ডির বাইরে এসে কাজ করলে তাদের নিয়ে কোন কারণ ছাড়াই তীর্যক মন্তব্যের ঝড় তোলেন পুরুষরা। এধরনের সংকীর্ণ মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে পারলে পশ্চিমা আর এশিয়ান পুরুষদের পার্থক্য কমে আসবে বলে মনে করেন বারটেন্ডার শিরিন।

এতো গেল বাঙালি নারী বারটেন্ডারের কথা।

বাঙালি পুরুষ সুরা পরিবেশনকারীরা কীভাবে কাজ করছেন তা নিয়ে কথা হলো সেন্ট্রাল লন্ডনের একটি পানশালায় কাজ করা সাইদুর তারেকের সঙ্গে।

তারেক জানালেন, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে রাত অব্দি কাজ করেন। তবে বেশি ভিড় লেগে থাকে শুক্র থেকে রোববার পর্যন্ত। আর এই উইকেন্ডের সময় দেখা মিলে নানা ধরনের মানুষের।

উইকেন্ডে এশিয়ান অল্পবয়সী তরুণ-তরুণীরা দলবেঁধে আসেন। তরুণীরা এশিয়ান বারটেন্ডারের সঙ্গে ততো বেশি কথা না বললেও তরুণরা নিজের থেকেই এগিয়ে এসে কথা বলেন।

এশিয়ান তরুণদের মাঝে দু’ধরণের বৈশিষ্ট্য দেখতে পান বলে উল্লেখ করেন তারেক- অযথা নিজেকে জাহির করা আর আন্তরিকতা। সবচেয়ে দামি হুইস্কি কিংবা ওয়াইন কিনতে দেখা যায় এশিয়ান তরুণদের। আর বারটেন্ডার যদি এশিয়ান হন তবে সেইসব তরুণরা নিজ উদ্যোগে এসে হিন্দি নয়তো উর্দুতে কথা বলা শুরু করেন।

বলে রাখা ভালো, ভারতীয় ও পাকিস্তানিরা মনে করেন বাঙালি মানেই হয় হিন্দি নয়তো উর্দুতে কথা বলবে। অনেকেই মনে করেন- বাঙালি মাত্রই ভারতীয়।

তারেক জানালো, সে কখনো সজ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানেও হিন্দি কিংবা উর্দুতে কথা বলেননি।

তার মতে, একবার যদি কেউ ভুল করে তাদের ভাষায় কথা বলা শুরু করেন তবে বাঙালিদের তারা পেয়ে বসেন আর জোর করে তাদের সঙ্গে নিজেদের ভাষায় কথা বলতে চান। ইংরেজি আর বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় কথা বলার বিষয়ে অপারগতা জানিয়ে এশিয়ান ক্রেতাদের সামলান তারেক।

ইউরোপিয়ান ক্রেতাদের ব্যাপারে তারেক জানালেন, একটু ভিন্ন কথা। ফরাসি কিংবা স্প্যানিশ ক্রেতারা ভাষাগত পার্থক্যের কারণে ঠিকমতো কথা বলতে না পারলেও ড্রিংকের অর্ডার ঠিকই দিতে পারেন। ইউরোপিয়ানরা মুখ খুললেই বোঝা যায় কার আদি নিবাস কোথায়।

আর এদের মাঝে পোলিশ পুরুষদের একটু রুক্ষ বলে মনে করে তারেক। তার ধারণা, পোলিশরা সব সময় উচ্চস্বরে আর একটু রূঢ় হয়ে কথা বলেন। তাই তারা যখন কোন ড্রিংকের অর্ডার দিতে আসেন তখন বিক্রেতাদের সঙ্গে মাঝে-মধ্যেই জড়িয়ে বাক-বিতণ্ডায় পড়েন।

পানশালায় আসা ব্রিটিশ তরুণীদের নিয়ে মজার একটা ঘটনা জানালেন তারেক। অনেক সময় ব্রিটিশ তরুণীরা বারটেন্ডারের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে উঠতে চান মাত্র ফ্রি ড্রিংকের জন্য।

মজার ব্যাপার হচ্ছে বেশির ভাগ তরুণীই একই ধরনের উছিলা দিয়ে ড্রিংকটি নিতে চান। আর তা হলো জন্মদিনের উছিলা। নিজের জন্মদিন উল্লেখ করে তরুণীরা প্রথমে শুভেচ্ছা আদায় করেন বারটেন্ডারের কাছ থেকে। পরে জন্মদিনের উপহার হিসেবে ড্রিংক চেয়ে বসেন।

তারেকও অবশ্য এসব বিষয় বোঝাপড়া করতে করতে এখন পটু। কীভাবে!

শুনুন তারেকের মুখ থেকেই।

ড্রিংক শেকারে (ঝাঁকুনি মেশিনে) সামান্য অ্যালকোহল আর বেশি পরিমাণে পানি মিশিয়ে তা কিছুক্ষণ ঝাঁকাঝাঁকি করে ‘বার্থডে গার্ল’কে দেওয়া হয়। ‘বার্থডে গার্ল’ মোটামুটি তা পেয়েই খুশি হয়ে যান।

তারেক জানালো, কখনো তার সহকর্মীর (নারী বা পুরুষ) সঙ্গে কেউ দুর্ব্যবহার করতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে বের করে দেওয়া হয়। দুর্ব্যবহারকারী নারী নাকি পুরুষ, এশিয়ান নাকি ইউরোপিয়ান তার তোয়াক্কা করা হয় না।

তারেক কিংবা শিরিনরা যুক্তরাজ্যে থাকেন বলে বারটেন্ডার পরিচয় নিয়ে তারা ততটা শঙ্কিত নন, যতটা সংকীর্ণ মনোভাব এশিয়ানরা বিশেষ করে বাঙালিরা তাদের প্রতি দেখান।

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশি কিংবা এশিয়ান রেস্টুরেন্টে যখন অ্যালকোহল বিক্রি হয় তখন কেউ কিছু মনে করেন না। তবে বারে কেউ কাজ করলে তাকে অনেকটা বাঁকা চোখে দেখা হয়।

এমনকি দেশ থেকে আসা নিজেদের বিয়ের প্রস্তাবগুলোও এখন হুমকিতে রয়েছে, মজা করে জানালেন তারেক ও শিরিন দুজনেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *